চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে বছরের পর বছর পড়ে আছে আমদানিকৃত পণ্যবোঝাই হাজার হাজার কনটেইনার। জায়গা দখল করে থাকা এসব কনটেইনার শুধু বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকেই ব্যাহত করছে না, এর সঙ্গে বাড়ছে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি, আমদানি ব্যয় এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ। বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, দীর্ঘদিনের পণ্যজটের কারণে বন্দরের পরিচালন সক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে ছিল ৯ হাজার ৩৩০ টিইইউ কনটেইনার। এগুলো ইয়ার্ডের প্রায় ২২ শতাংশ জায়গা দখল করে রেখেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এসব কনটেইনার অপসারণ করা গেলে বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়েই বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি পণ্য হ্যান্ডলিং সম্ভব।
প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুলসংখ্যক কনটেইনার বছরের পর বছর বন্দরে পড়ে থাকছে কেন?
বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে কাস্টমসের মূল্যায়ন, মামলা, রিট, তদন্ত ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক পণ্য আটকে থাকে। একপর্যায়ে পণ্যের মূল্য অপেক্ষা কনটেইনারের ডেমারেজ ও স্টোরেজ মাশুলই কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা কনটেইনারগুলোর বকেয়া স্টোরেজ মাশুল ইতোমধ্যে ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
এতে একদিকে বন্দরের জায়গা আটকে থাকছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের চাপ পণ্যের মূল্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়ছে।
পণ্যজটের আর্থিক ক্ষতির একটি চিত্র পাওয়া যায় রক সল্ট আমদানির একটি চালানে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দাবি, ৬ হাজার ৪৪০ ডলারের পণ্যের বিপরীতে কাস্টমসের বিলম্বের কারণে ডেমারেজসহ বিভিন্ন চার্জ বেড়ে প্রায় ২২ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ পণ্যের মূল্যের প্রায় সাড়ে তিন গুণ অর্থ শুধু বিভিন্ন চার্জেই গুনতে হচ্ছে আমদানিকারককে।
প্রতিষ্ঠানটি কাস্টমসের বিরুদ্ধে হয়রানি ও ঘুষ দাবির অভিযোগ তুলেছে। তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আরও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায় একটি প্লাস্টার অব প্যারিসবোঝাই কনটেইনারের ঘটনায়। ২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে আসা কনটেইনারটি ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৭৬৪ দিন বন্দরে পড়ে ছিল।
এত দীর্ঘ সময় বন্দরে পড়ে থাকার কারণে শুধু বন্দর মাশুলই দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার ডলার।
এ ধরনের ঘটনা প্রশ্ন তৈরি করছে, আমদানি করা পণ্য দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা যেখানে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে একটি কনটেইনার কীভাবে প্রায় পাঁচ বছর বন্দরে পড়ে থাকে?
বন্দর ইয়ার্ডের চিত্র শুধু কনটেইনারেই সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে বর্তমানে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৯৯ প্যাকেজ এলসিএল কার্গো, ৬ হাজার ৭৯২ প্যাকেজ বাল্ক কার্গো এবং ৭৭৫ প্যাকেজ ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পণ্য পড়ে রয়েছে।
এর মধ্যে কিছু পণ্য ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দরে অবস্থান করছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় এসব পণ্যের বড় অংশই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
অর্থাৎ একদিকে বন্দরের মূল্যবান জায়গা আটকে আছে, অন্যদিকে পণ্য নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পণ্য ঘিরে থাকা অর্থও কার্যত অচল হয়ে পড়ছে।
দীর্ঘদিনের এই জট নিরসনে গত ২ জুলাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেখানে নিলামযোগ্য ও পরিত্যক্ত পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির অনুরোধ জানানো হয়।
তবে কাস্টমসের দাবি, বন্দরে থাকা সব কনটেইনার নিলামযোগ্য নয়। মামলা, রিট, তদন্ত, মূল্যায়ন-সংক্রান্ত বিরোধ এবং আদালতের আদেশের কারণে অনেক চালান আইনগতভাবে আটকে রয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নিলামযোগ্য ছিল ৫ হাজার ৬৩০টি কনটেইনার। এর মধ্যে ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত নিলামের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে ১ হাজার ৯৮টি কনটেইনার। আরও ৫৪টি কনটেইনারের পণ্য ধ্বংস করা হয়েছে এবং ১৩২টির ধ্বংস প্রক্রিয়া চলমান।
তারপরও হাজার হাজার কনটেইনার ও বিপুল পরিমাণ পণ্য ইয়ার্ডে পড়ে থাকার বিষয়টি সংকটের ব্যাপ্তি স্পষ্ট করছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। ফলে বন্দরের ইয়ার্ডে দীর্ঘদিন পণ্য আটকে থাকার প্রভাব শুধু বন্দর কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
কনটেইনার পড়ে থাকায় নতুন পণ্য রাখার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে। কনটেইনারের ব্যবহারকাল বাড়ায় শিপিং কোম্পানির ব্যয়ও বাড়ছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ডেমারেজ ও স্টোরেজ মাশুল গুনতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হকের ভাষ্য, কাস্টমসে একটি চালানের মূল্যায়ন শেষ হতে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগলেও চার দিন পর থেকেই ডেমারেজ আরোপ করা হয়। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহেও প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজনের মতে, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আনা পণ্য বছরের পর বছর বন্দরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোও কনটেইনার ব্যবহারের সুযোগ না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পণ্যজটের জন্য একক কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা কঠিন। বন্দরের দাবি, নিলামযোগ্য পণ্য দ্রুত সরানো প্রয়োজন। কাস্টমস বলছে, অনেক পণ্য মামলা ও আইনি জটিলতায় আটকে আছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘসূত্রতার আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
এই অবস্থায় সংকট সমাধানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব, নিলামযোগ্য পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি কাস্টমস-সংক্রান্ত বিরোধের জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার এবং পৃথক কনটেইনার ইয়ার্ড গড়ে তোলা যেতে পারে।
সচেতন নাগরিক কমিটির চট্টগ্রাম নগর শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী কাস্টমস-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন রিভিউ প্যানেল ও বিশেষায়িত কাস্টমস বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তার মতে, আমদানিকৃত পণ্য দীর্ঘদিন বন্দরে আটকে থাকলে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ক্ষতির চাপ ক্রমেই বাড়ে। তাই দ্রুত ও স্বচ্ছ বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ছাড়া এ সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসা কঠিন।
চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে পড়ে থাকা ৯ হাজার ৩৩০ টিইইউ কনটেইনার তাই শুধু কিছু আটকে থাকা পণ্যের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন্দরের সক্ষমতা, ব্যবসায়ীদের বাড়তি ব্যয়, আমদানি পণ্যের মূল্য, শিপিং খাতের ক্ষতি এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতির ওপর পড়া একটি বড় ধরনের চাপ।