অভাবের কারণে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল মাত্র ১৪ বছর বয়সে। হাতে ১০ টাকা নিয়ে গ্রাম ছেড়ে আসা বাদশা মিয়ার চার শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এখন কাজ করছেন ২৫ হাজারের বেশি মানুষ।
হাতে সম্বল মাত্র ১০ টাকা। বয়স তখন ১৪ বছর। পরিবারের আর্থিক অনটনে স্কুলের পড়াশোনাও ছেড়ে দিতে হয়েছিল। সেই অবস্থায় ১৯৭৫ সালে মাদারীপুরের শিবচর থেকে ঢাকার উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন বাদশা মিয়া। প্রায় পাঁচ দশক পর সেই কিশোরই এখন দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের সফল উদ্যোক্তা। তাঁর চারটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের।
বাদশা মিয়ার শিল্পায়নের প্রভাব পড়েছে কারখানার সীমানার বাইরেও। হবিগঞ্জের মাধবপুরের হরিতলায় তাঁর শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঘিরে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বেড়েছে বাসাবাড়ির চাহিদা, জমির মূল্য ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। নতুন দোকান, খাবারের হোটেলসহ নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় এলাকার অর্থনৈতিক চিত্রও বদলে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বাদশা মিয়ার উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা অবশ্য বড় কোনো বিনিয়োগ দিয়ে হয়নি। নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে এক বান্ডিল সুতা বাকিতে কিনে বিক্রি করে প্রথমবার তাঁর লাভ হয়েছিল মাত্র ৪ টাকা। ছোট সেই ব্যবসাই ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
১৯৭৬ সালে পাইকারি সুতা বিক্রির লাইসেন্স নেন তিনি। এরপর ১৯৮৩ সালে একাধিক বস্ত্রকলের সুতা বিক্রির একক এজেন্ট হওয়ার সুযোগ পান। সেখান থেকেই দ্রুত বাড়তে থাকে তাঁর ব্যবসার পরিধি।
সুতা ব্যবসায় অবস্থান শক্ত করার পর পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে বিনিয়োগ শুরু করেন বাদশা মিয়া। ১৯৯৯ সালে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটীতে পোশাক কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতে যাত্রা শুরু করেন। পরে কারখানাটি ময়মনসিংহের ভালুকায় স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সেখানে প্রায় দুই হাজার মেশিন রয়েছে এবং কাজ করছেন হাজারো শ্রমিক।
২০০৩ সালে ভালুকায় বস্ত্রকল প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এরপর ব্যবসার পরিধি আরও বাড়ে। ২০১৬ সালে হবিগঞ্জে প্রায় আড়াইশ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন ডেনিম উৎপাদন কারখানা। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়।
বর্তমানে বাদশা মিয়ার চারটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মাধ্যমে বছরে কয়েকশ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখা হচ্ছে। বাদশা টেক্সটাইল ও কামাল ইয়ার্ন টানা পাঁচবার রপ্তানি ট্রফি অর্জন করেছে।
মাধবপুরের হরিতলায় বাদশা পাইওনিয়ার গার্মেন্টস ও পাইওনিয়ার ডেনিম প্রতিষ্ঠার পর শিল্পকারখানাকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক বলয় তৈরি হয়েছে। কাজের সন্ধানে দূর-দূরান্ত থেকে শ্রমিক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ এলাকায় আসায় বাসাবাড়ির চাহিদা বেড়েছে। এর প্রভাবে বাসাভাড়া ও জমির দামও বেড়েছে।
মানুষের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় নতুন দোকানপাট, খাবারের হোটেল ও বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত ছিল, শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার পর সেখানে মানুষের চলাচল ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে প্রত্যক্ষভাবে কারখানায় চাকরি না করা স্থানীয় মানুষও বিভিন্নভাবে উপকৃত হচ্ছেন।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি বাদশা মিয়া। তাঁর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানকে টেকসই করতে হলে কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিশ্রম করতে হয়। তাই ষাট বছর বয়স পার হওয়ার পরও নিয়মিত কারখানায় সময় দেন তিনি। প্রয়োজনে মাঝরাতেও কারখানায় গিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
নিজের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় টিকে থাকুক এবং ভবিষ্যতে আরও মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করুক, এমন স্বপ্ন দেখেন বাদশা মিয়া। ব্যবসার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে দুই ছেলে কামাল উদ্দিন আহমেদ ও মহিউদ্দিন আহমেদকেও যুক্ত করেছেন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।
১৯৭৫ সালে ১০ টাকা হাতে নিয়ে গ্রাম থেকে বেরিয়ে আসা সেই কিশোরের কাছে এখন নিজের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আকার বা বিনিয়োগের পরিমাণ নয়। তাঁর ভাষায়, অজপাড়া গাঁ থেকে উঠে এসে শিল্পকারখানা গড়ে হাজারো মানুষের রুটিরুজির ব্যবস্থা করতে পারাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এক বান্ডিল সুতা বিক্রি করে ৪ টাকা লাভ থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ ২৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানে পৌঁছেছে। আর মাধবপুরের হরিতলা হয়ে উঠেছে সেই শিল্পযাত্রার প্রভাবে বদলে যাওয়া একটি এলাকার উদাহরণ।
সোহাগ মিয়া, মাধবপুর থেকে