নোয়াখালী জেলাজুড়ে গত কয়েক মাসে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। জেলার বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শহর থেকে গ্রাম, আবাসিক ভবন থেকে ব্যবসায়ীর বাসা, এমনকি সড়কে চলাচলরত যানবাহন পর্যন্ত কোনো কিছুই এখন আর অপরাধীদের নজর এড়াচ্ছে না। একের পর এক ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তীব্র হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের জুন মাসে নোয়াখালী সদর উপজেলার মাইজদী শহরের ফকিরপুর এলাকায় পাশাপাশি দুটি ভবনের ছয়টি ফ্ল্যাটে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। আলম মঞ্জিল ও আলামিন মঞ্জিল নামের দুটি ভবনে সংঘটিত এই চুরিতে প্রায় পঁচিশ ভরি স্বর্ণালংকার ও দশ লাখ টাকা লুট হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে একজন অপরিচিত যুবককে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যেতে দেখা গেলেও ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও অপরিচিত ব্যক্তি শনাক্তে ব্যর্থতা এই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
এর কিছুদিন পরই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় একের পর এক দোকান ও বাসাবাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটতে থাকে। ভুক্তভোগীদের একজন জানান, তার বাসা থেকে প্রায় তেরো ভরি স্বর্ণ, চার ভরি রুপা, নগদ নয় লাখ টাকা, দুই হাজার ইউরো এবং কয়েকটি ব্যাংক চেকবই খোয়া গেছে। বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে দুষ্কৃতকারীরা নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করলেও তা ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত নজরদারি ব্যবস্থা নেই।
শুধু বাসাবাড়িতে চুরি নয়, জেলা শহরে মোটরসাইকেল চুরির প্রবণতাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন মাসের ব্যবধানে জেলা শহরে অন্তত ত্রিশটি মোটরসাইকেল চুরি হয়েছে, যার মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে খোদ সুধারাম থানার কয়েক গজ দূরত্বেই। অনেক ক্ষেত্রে সিসিটিভি ফুটেজে চোরের চেহারা স্পষ্ট ধরা পড়লেও পরবর্তীতে না চোর, না মোটরসাইকেল, কোনোটিরই হদিস মেলেনি। প্রাসঙ্গিক নথিপত্র না থাকার কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ দায়ের করা থেকেও বিরত থাকছেন বলে জানা গেছে।
ডাকাতির ঘটনাও থেমে নেই। সদর উপজেলার শ্রীপুর এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডাকাতির ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও একটি লোহার স্টিক উদ্ধার করে। জেলা পুলিশ সুপার এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, গ্রেপ্তার চারজনের বিরুদ্ধেই ডাকাতি, অস্ত্র, চুরি ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে এক ডজনেরও বেশি মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় জেলায় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। ঘটনাস্থল থেকে ডাকাতদের ফেলে যাওয়া দেশীয় অস্ত্র ও ভাঙা তালাও উদ্ধার করা হয়।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা পুলিশ একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই ঠেকাতে মধ্যরাতে জেলার বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে পুলিশ সুপার জানিয়েছেন। এছাড়া অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে নতুন পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। মোটরসাইকেল চুরি প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার এন এম নাসিরুদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে জানান, গত তিন মাসে এ সংক্রান্ত পাঁচটি মামলা হয়েছে এবং পুরো শহরকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার কাজ চলমান রয়েছে।
তবে পুলিশের এই আশ্বাসের বিপরীতে বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, নোয়াখালী পৌর শহরে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার বড় অংশই বর্তমানে অচল অবস্থায় পড়ে আছে, আর এই সুযোগেই অপরাধীরা ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ক্যামেরা অকেজো থাকার কারণে ঘটনার পর তদন্তে বাড়তি সময় ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী শনাক্তই করা যাচ্ছে না। পৌরবাসীর দাবি, দ্রুত এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো প্রয়োজন।
বিশ্লেষণে আরও একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো আবাসিক ভবনগুলোতে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি। অনেক ঘটনায় দেখা গেছে, চুরি বা ডাকাতির আগে অপরিচিত ব্যক্তিরা দারোয়ান বা পরিচিত মুখ সেজে ভবনে প্রবেশের সুযোগ নিচ্ছে, অথবা প্রকৃত দারোয়ানের অনুপস্থিতিতে অচেনা লোকজনের অবাধ যাতায়াত ঘটছে। ভবন মালিক ও বাসিন্দাদের সচেতনতার অভাব, দারোয়ান নিয়োগে থানা-পুলিশের তথ্য যাচাই না করা এবং অধিকাংশ ভবনে কার্যকর সিসি ক্যামেরার অনুপস্থিতি, এই তিনটি বিষয় মিলিয়েই অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নোয়াখালীতে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও তা এখনো পর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়নি। চেকপোস্ট, পুলিশ ক্যাম্প কিংবা গ্রেপ্তার অভিযান চললেও মূল সমস্যা, অর্থাৎ শহর ও আবাসিক এলাকায় কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থার ঘাটতি, এখনো রয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সিসি ক্যামেরা মেরামত ও সম্প্রসারণ, দারোয়ান নিয়োগে বাধ্যতামূলক থানা-যাচাই এবং এলাকাভিত্তিক নাইট গার্ড ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে এই প্রবণতা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। অন্যথায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।