লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশসহ ১৪ দেশকে নিয়ে নতুন একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব।
রিয়াদে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে জোট গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত এই জোটে বাংলাদেশ ছাড়াও তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, ইয়েমেন, জিবুতি, সোমালিয়া, সুদান এবং কোমোরোসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
জোট গঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং নিয়মিত সামুদ্রিক সামরিক মহড়া পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও রয়েছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, জোটটি আত্মরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে গঠিত হয়নি। এর প্রধান কার্যালয় সৌদি আরবে থাকবে। ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্যও জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
জোট গঠনের পেছনে ইয়েমেনের হুথিদের হুমকিকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লোহিত সাগর ও আশপাশের নৌপথে সৌদি পতাকাবাহী এবং সৌদি আরবগামী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই নতুন এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জোটের সামরিক কাঠামোতে সৌদি আরব নেতৃত্ব ও অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে উৎসের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিসরের মতো দেশগুলো যুদ্ধজাহাজ, টহল নৌযান ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোর অংশগ্রহণ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, কৌশলগত পরিকল্পনা ও যৌথ নৌ মহড়াকেন্দ্রিক হতে পারে। তবে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
এদিকে নতুন জোটের সম্ভাব্য প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে। তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়লে তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
জোটে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন যোগ দিলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এখনো এতে যুক্ত হয়নি। ওমানের ঐতিহ্যগত নিরপেক্ষতা ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা এবং ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে লোহিত সাগর অঞ্চলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ থাকায় দেশটি সৌদি নেতৃত্বাধীন কাঠামোর বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান নিয়েও জোট গঠনের পর কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ না দিলেও সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে লজিস্টিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে উৎসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও লোহিত সাগরে নিজস্ব নৌ-সুরক্ষা কার্যক্রম রয়েছে এবং নতুন জোটের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা জোরদারের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে জোট গঠনের উদ্যোগকে হুথিরা তাদের বিরুদ্ধে উসকানি হিসেবে দেখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা সৌদি পতাকাবাহী ও সৌদি আরবগামী জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধের হুমকি দিয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
জোট গঠনের ফলে ইরানের সঙ্গেও সৌদি আরবের উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে উৎসের বিশ্লেষণে আশঙ্কা করা হয়েছে। ইরান নতুন এই উদ্যোগকে লোহিত সাগর অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব কমানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরানের কঠোর অবস্থান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন এই নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব অঞ্চলের নৌপথের নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর সামরিক সমন্বয়, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং হুথি-সৌদি উত্তেজনা কোন দিকে গড়ায় তার ওপর।