মানুষের অন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়া কি কয়েক বছর আগেই জানিয়ে দিতে পারে, কার টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি? সুইডেনের বড় একটি গবেষণার ফল বলছে, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সুইডেনের চালমার্স ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষকেরা জানিয়েছেন, ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার অনেক আগেই অন্ত্রের নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া ও বিপাকীয় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তাঁদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী সেল রিপোর্টস মেডিসিনে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। এ সময় শরীর ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দিতে শুরু করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ক্রমে বাড়তে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে অনেকে জটিলতা শুরু হওয়ার পরই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন। এ কারণে আগাম সতর্ক সংকেত শনাক্ত করা গেলে রোগটি প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
হেলথফার্ম গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে সুইডেনের ৪ হাজার ৬৮৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মলের নমুনা পরীক্ষা করেন গবেষকেরা। এরপর গড়ে পাঁচ বছর ধরে তাঁদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এই সময়ের মধ্যে ৩৮৩ জনের টাইপ-২ ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। পরে তাঁদের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার গঠন সুস্থ থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে তুলনা করে গবেষকেরা কয়েকটি স্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পান।
গবেষণায় নয়টি ব্যাকটেরিয়া প্রজাতির সঙ্গে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত আবিষ্কারগুলোর একটি ছিল আক্কেরমানসিয়া মিউসিনিফিলা নামের ব্যাকটেরিয়া। আগের অনেক গবেষণায় এই ব্যাকটেরিয়াকে উপকারী হিসেবে বর্ণনা করা হলেও নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এর মাত্রা বেশি থাকলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বেশি হতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, এর ব্যাখ্যা খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার পাওয়া গেলে এই ব্যাকটেরিয়া সেই আঁশ থেকেই পুষ্টি গ্রহণ করে। কিন্তু খাদ্যতালিকায় আঁশ কম থাকলে এটি অন্ত্রের সুরক্ষামূলক মিউকাস স্তর খেতে শুরু করতে পারে। এতে প্রদাহ বাড়তে পারে এবং শরীরের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।
গবেষণায় কপ্রোকক্কাস ক্যাটাস নামের আরেকটি ব্যাকটেরিয়াকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। যাদের অন্ত্রে এই ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ খুব কম ছিল, তাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে যাদের শরীরে এই ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি ছিল, তাদের ক্ষেত্রে একই প্রবণতা দেখা যায়নি। এতে ইঙ্গিত মিলছে, দীর্ঘমেয়াদি বিপাকীয় সুস্থতার জন্য অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ডায়াবেটিস ঝুঁকি নির্ণয়ের কার্যকর জৈব নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তখন শুধু রক্ত পরীক্ষা, ওজন বা পারিবারিক ইতিহাসের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকেরা ঝুঁকি মূল্যায়নে মলের নমুনাও বিবেচনায় নিতে পারেন।
অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া খাদ্যাভ্যাস, প্রোবায়োটিক বা ভবিষ্যতের অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব। তাই এগুলো ব্যক্তিভিত্তিক প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার লক্ষ্যবস্তু হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর আরও বড় পরিসরের গবেষণায় এসব ফল নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে কোনো ব্যক্তির অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
তারপরও গবেষণার ফল বর্তমান স্বাস্থ্যপরামর্শকে আরও জোরালো করেছে। বিশেষজ্ঞরা শাকসবজি, ফল, ডালজাতীয় খাবার ও পূর্ণ শস্যের মতো আঁশসমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়ার পরামর্শ দেন, কারণ এগুলো অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বা জীবাণুসমষ্টিকে স্বাস্থ্যকর রাখতে সহায়তা করে।
গবেষণাটির বিশেষত্ব হলো, ডায়াবেটিস দেখা দেওয়ার আগেই অংশগ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। ফলে রোগের আগের পর্যায়ের জৈব পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে গবেষণায় শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেলেও এসব ব্যাকটেরিয়া সরাসরি ডায়াবেটিস সৃষ্টি করে, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
তবু গবেষণাটি ভবিষ্যৎ চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলাফল নিশ্চিত হলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা বিশ্বের অন্যতম সাধারণ দীর্ঘস্থায়ী রোগ টাইপ-২ ডায়াবেটিসের আগাম শনাক্তকরণ ও ব্যক্তিভিত্তিক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।