মাত্র কয়েক দিন আগেও একমাত্র ছেলে আভানকে নিয়ে গর্বের কথা লিখেছিলেন বাবা মৃদুল ইসলাম। প্লে গ্রুপ থেকে নার্সারিতে ওঠার আনন্দে ছেলের ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, ‘জীবন শুধু ফলাফলে মাপা যায় না, হৃদয়ের আনন্দ, সাহস, মমতা আর ভালোবাসাই জীবনের আসল অর্জন।’ ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে লিখেছিলেন, ‘বাবা তোমাকে ভালোবাসে এবং তোমাকে নিয়ে গর্বিত।’
নোয়াখালীতে গ্রামবাংলার মানুষের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম (বিজ) নতুন শাখার উদ্বোধন
কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই সন্তানকেই হারিয়েছেন তিনি। শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাড়ে চার বছর বয়সী আভানের মৃত্যু হয়।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়া মৃদুল ইসলামের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল চিকিৎসকের সরাসরি অনুপস্থিতির কারণে তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়েছে।
মৃদুল বলেন, ‘আমার বাচ্চা সুস্থ বাচ্চা, হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। আমার বাচ্চা ফেরত দেন, আর কিছু লাগবে না।’
সন্তানের মৃত্যুর পর কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই। আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই। সে নাই, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে আভানকে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা ডেঙ্গু সন্দেহে তার চিকিৎসা শুরু করেন।
পরিবারের দাবি, হাসপাতালে একাধিকবার পরীক্ষা করা হলেও আভানের ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসে। এরপরও ডেঙ্গুর বিষয়টি বিবেচনায় রেখে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ স্বজনদের।
পরিবারের সদস্যরা জানান, হাসপাতালে থাকার সময় আভান স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করছিল। বাসা থেকে তার জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া হতো। শিশুটি বাবাকে ফোন করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছিল বলে জানান মৃদুল ইসলাম।
গত ২ অক্টোবর আভানকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না এবং টেলিফোনে দেওয়া নির্দেশনার ভিত্তিতে শিশুটির চিকিৎসা চলছিল।
স্বজনদের ভাষ্য, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছিল আভানের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। তবে পরদিন শনিবার বিকেল ৫টার দিকে শিশুটির মৃত্যু হয়।
পরিবারের আরও অভিযোগ, চিকিৎসাধীন অবস্থায় আভানকে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল। এরপর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়ে ‘শক সিনড্রোম’ দেখা দেয় এবং তার মৃত্যু হয় বলে দাবি স্বজনদের।
চিকিৎসার কেস সামারিসহ প্রয়োজনীয় মেডিকেল নথি পেতেও শুরুতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। পরে তারা এসব নথি সংগ্রহ করে।
স্বজনদের দাবি, ওই মেডিকেল নথিতে শিশুটির রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন ও শক সিনড্রোমের তথ্য রয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসায় ত্রুটির অভিযোগ আরও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে পরিবার।
আভানের বাবা মৃদুল ইসলাম একজন গণমাধ্যমকর্মী। ছেলেকে ঘিরে পরিবারের নানা পরিকল্পনা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, আভানকে স্কুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ছেলেকে সব সময় নিজের কাছে রাখতেন এবং তাকে নিয়ে ঘুরতেন বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে পরিবার। একই সঙ্গে শিশুটির মৃত্যুর কারণ ও চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
শিশুটির মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।