প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে সময়ের সঙ্গে বদলেছে মসজিদটির অবয়ব। তুরস্কের বিখ্যাত ব্লু মসজিদের আদলে নির্মিত বর্তমান স্থাপত্যের পাশাপাশি এখানে গড়ে উঠেছে মাদ্রাসা, লাইব্রেরি, আবাসন ও আধুনিক ওজুখানা।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ফতেহনগর গ্রামে প্রায় ২০০ বছরের ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোহাম্মদ আলী শিকদার জামে মসজিদ কমপ্লেক্স। তুরস্কের বিখ্যাত ব্লু মসজিদের আদলে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য এখন দক্ষিণ চট্টগ্রামে সবার নজর কাড়ছে। তবে মসজিদটির পরিচয় শুধু স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘ সময় ধরে এটি স্থানীয় মানুষের ইবাদত, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতির কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে।
যে ইতিহাসের শুরু প্রায় দুই শতাব্দী আগে
১৮০০ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে সমাজপতি মোহাম্মদ আলী শিকদার ফতেহনগর গ্রামের গোড়াপত্তন করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত জনপদে পরবর্তী সময়ে শিকদার পরিবারের অন্যতম কৃতী সন্তান ওবায়েদ উল্লাহ একটি জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। সেই ছোট পরিসরের মসজিদই বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে বর্তমানের বৃহৎ কমপ্লেক্সে রূপ নিয়েছে।
ধাপে ধাপে বদলেছে মসজিদের অবয়ব
১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে জোয়ারা বোর্ডের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নজিরউদ্দিন মুসল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের পাশে একটি পুকুর খনন করেন। দীর্ঘদিন ধরে পুকুরটি ওজু ও স্থানীয়দের দৈনন্দিন প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে।
১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে দেশবরেণ্য আইনজ্ঞ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অ্যাডভোকেট বদিউল আলম মসজিদটি আংশিক পাকা করার উদ্যোগ নেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে তাঁর উদ্যোগেই মসজিদ আরও সম্প্রসারণ করা হয়। এ সময় মোজাইক মেঝে স্থাপন ও পাকা দিঘা নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়। এতে একদিকে মুসল্লিদের জায়গা বাড়ে, অন্যদিকে মসজিদের অবকাঠামোতেও আসে পরিবর্তন।
আধুনিক কমপ্লেক্সে রূপান্তর
মসজিদটির বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে। হিজ এক্সেলেন্সি জিয়াউদ্দিন আদিল ও সমাজসেবিকা সালমা খানমের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে পুরোনো মসজিদটি সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
বৃহৎ পরিসরের নতুন কমপ্লেক্সে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর পাশাপাশি প্রশস্ত নামাজের স্থান ও দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। তুরস্কের ব্লু মসজিদের স্থাপত্যের আদলে তৈরি এর নকশা মসজিদটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।
এরপর ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে একই উদ্যোগে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের আবাসন, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, মাদ্রাসা ভবন এবং আধুনিক ওজুখানা নির্মাণ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মসজিদটি শুধু নামাজের স্থান নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা ও সেবাকেন্দ্র হিসেবেও বিকশিত হয়েছে।
ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা ও মানবসেবা
বর্তমানে মোহাম্মদ আলী শিকদার জামে মসজিদ কমপ্লেক্সে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি জুমা ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। শিশুদের কুরআন শিক্ষা, নূরানী ও দ্বীনি পাঠদান এবং ইসলামিক লাইব্রেরির কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে মসজিদ কমপ্লেক্সটি।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদ আলী শিকদার জামে মসজিদ কমপ্লেক্স বর্তমান প্রজন্মের কাছে যেমন অতীতের স্মারক, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা ও সমাজসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে।