কয়েক হাজার টাকার ছাড়, বিনিময়ে লাগেজের সামান্য জায়গা। প্রস্তাবটি প্রথম শুনলে একজন উমরাহযাত্রীর কাছে লাভজনকই মনে হতে পারে। এমনিতেই বিমানভাড়া, ভিসা, আবাসন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে পবিত্র এই সফরের ব্যয় কম নয়। সেখানে ২০ কিংবা ২৫ হাজার টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ এলে অনেকেই হয়তো দ্বিতীয়বার ভাববেন না। অথচ এই সামান্য ছাড়ের বিনিময়ে অন্যের মালামাল বহনের সিদ্ধান্তই বিদেশের মাটিতে একজন যাত্রীকে ফেলতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত জিজ্ঞাসাবাদ, কাস্টমস জটিলতা কিংবা আরও গুরুতর বিপদে।
হজ বা উমরাহর উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ার সময় নিজের লাগেজে কী রয়েছে, তা জানা এবং তার দায় বহন করা যাত্রীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিচিত কিংবা অপরিচিত কেউ যদি বলেন, ‘ছোট একটি প্যাকেট, কোনো সমস্যা হবে না’, শুধু আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে সেটি সঙ্গে নেওয়া নিরাপদ সিদ্ধান্ত নয়। প্রশ্ন করা দরকার, প্যাকেটের ভেতরে কী আছে, সেটি কার, কোথা থেকে এসেছে, কেন একজন তৃতীয় ব্যক্তির লাগেজে পাঠানো হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র রয়েছে কি না।
ঝুঁকির জায়গাটি এখানেই। যাত্রী হয়তো বিশ্বাস করে কোনো প্যাকেট গ্রহণ করলেন, কিন্তু গন্তব্যে গিয়ে সেটির ভেতরে ঘোষণাযোগ্য, নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ কোনো বস্তু পাওয়া গেলে পরিস্থিতি মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে। তখন ‘আমি জানতাম না’ বললেই সব প্রশ্নের অবসান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ পাসপোর্টটি যাত্রীর, লাগেজটিও তার নামেই বহন করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে তাকেই প্রথমে ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে।
সোনা বা মূল্যবান ধাতু, নগদ অর্থ, ওষুধ, ইলেকট্রনিক পণ্য, বাণিজ্যিক পণ্য কিংবা সিল করা অপরিচিত প্যাকেট বহনের ক্ষেত্রে তাই বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। এক দেশ থেকে অন্য দেশে কোন পণ্য কতটুকু নেওয়া যাবে, কোনটি ঘোষণা করতে হবে এবং কোনটির জন্য অনুমতি বা কাগজপত্র প্রয়োজন, তা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও কাস্টমস বিধির ওপর নির্ভর করে। ফলে অন্যের মুখের কথাকে বৈধতার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বিশেষভাবে সন্দেহ করা উচিত তখনই, যখন অস্বাভাবিক কম দামের কোনো হজ বা উমরাহ প্যাকেজের সঙ্গে যাত্রীর লাগেজ ব্যবহার করার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। বাজারদরের তুলনায় বড় অঙ্কের ছাড় দেওয়া হচ্ছে কেন, সেই প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কয়েক হাজার টাকা কম খরচের সুবিধা কখনোই এমন একটি অজানা দায় নেওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে না।
প্যাকেজ নির্বাচনের সময় শুধু মূল্য দেখাও তাই যথেষ্ট নয়। বিমান টিকিট, ভিসা, আবাসন, পরিবহন, খাবার, হোটেলের অবস্থান, সংশ্লিষ্ট সেবার বিস্তারিত বিবরণ এবং অর্থ পরিশোধের প্রমাণ যাচাই করা জরুরি। কোনো প্যাকেজ অস্বাভাবিক সস্তা হলে সেই কম দামের অর্থনৈতিক কারণও জানতে হবে। বিশেষ করে যাত্রীর ব্যাগে অন্য কারও মালামাল বহনের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শর্ত রয়েছে কি না, তা আগেই পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার।
একটি সহজ নীতি বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে: যে বস্তুর ভেতরে কী আছে, উৎস কোথায়, মালিক কে এবং বহনের বৈধতা কী, তা নিজে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না, সেই বস্তু নিজের লাগেজে না নেওয়া। কারও অনুরোধ, আর্থিক প্রলোভন কিংবা ‘কিছু হবে না’ ধরনের আশ্বাস এই নীতির ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ হওয়া উচিত নয়।
হজ ও উমরাহ মুসলমানের কাছে নিছক বিদেশভ্রমণ নয়। এটি ইবাদত, তাওবা ও আত্মশুদ্ধির সফর। সেই সফরের খরচ কমানোর চেষ্টা স্বাভাবিক, কিন্তু সাশ্রয়ের সঙ্গে বৈধতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সন্দেহজনক কোনো সুবিধার বিনিময়ে নিজের পরিচয়, পাসপোর্ট কিংবা লাগেজ অন্যের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া পবিত্র সফরকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে।
পরিবারের প্রবীণ সদস্য কিংবা প্রথমবার হজ-উমরাহ করতে যাওয়া ব্যক্তিদের এ বিষয়ে আরও সচেতন করা প্রয়োজন। আবেগ, বিশ্বাস কিংবা কম খরচের আকর্ষণে তারা যেন এমন কোনো মালামাল বহন না করেন, যার প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নন।
শেষ পর্যন্ত হিসাবটি খুব সহজ। কয়েক হাজার টাকা বাঁচানো যায় আবার উপার্জনও করা যায়। কিন্তু বিদেশের বিমানবন্দর বা সীমান্তে একটি অজানা প্যাকেট নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতার মূল্য কতটা বড় হতে পারে, তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। তাই পবিত্র সফরে লাগেজে থাকুক নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, অন্যের অজানা দায় নয়।