হঠাৎ হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়া নয়, হৃদ্যন্ত্রের দুর্বল হয়ে পড়ার নাম ‘হার্ট ফেইলিউর’। শুরুতে লক্ষণগুলো সাধারণ মনে হলেও সময়মতো সচেতন না হলে তা ডেকে আনতে পারে অকাল বিপর্যয়।
‘হার্ট ফেইলিউর’—শব্দটি শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে হঠাৎ হৃদ্স্পন্দন থেমে মৃত্যুর ছবি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। হার্ট ফেইলিউর মানে হৃদ্যন্ত্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; বরং এর অর্থ হলো হৃৎপিণ্ড শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারছে না, অথবা অতিরিক্ত চাপের মুখে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ আজ এ সমস্যায় ভুগছেন। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, অতীতের হার্ট অ্যাটাক, করোনারি আর্টারি ডিজিজ কিংবা ভাল্ভের সমস্যার কারণেও হৃদ্যন্ত্র ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে। হার্ট ফেইলিউরের লক্ষণগুলো অনেক সময় অত্যন্ত ধীরগতিতে শরীরে বাসা বাঁধে, যা আমরা সাধারণ ক্লান্তি বা বয়সের স্বাভাবিক প্রভাব ভেবে ভুল করি। অথচ এই নীরব সংকেতগুলো চিনে সময়মতো ব্যবস্থা নিলে বড় ধরনের বিপদ সহজেই এড়ানো সম্ভব।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করা প্রাণঘাতী হতে পারে:
১. অল্পতেই শ্বাসকষ্ট ও শোবার সময় দম আটকে আসা
হার্ট ফেইলিউরের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো শ্বাসকষ্ট। শুরুতে হয়তো একটু ভারী কাজ, দ্রুত হাঁটা বা সিঁড়ি ভাঙার সময় শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তবে সমস্যা জটিল রূপ নিলে বিছানায় সোজা হয়ে শোয়া অবস্থাতেও দমবন্ধ অনুভূতি হয়। হৃদ্যন্ত্র রক্ত ঠিকমতো পাম্প করতে না পারায় ফুসফুসে তরল বা পানি জমতে শুরু করে, যা শ্বাসকষ্টের মূল কারণ।
২. পা, গোড়ালি ও পেটে অস্বাভাবিক ফোলাভাব (পানি আসা)
শরীরে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হলে কিডনি বাড়তি লবণ ও পানি শরীর থেকে বের করতে পারে না। ফলে শরীরের নিম্নাংশ—বিশেষ করে পায়ের পাতা, গোড়ালি ও পায়ে তরল জমে ফুলে যায়। অনেক সময় পেটেও তরল জমে পেট ভারী মনে হতে পারে।
৩. হঠাৎ দ্রুত ওজন বৃদ্ধি
আপনি যদি দেখেন ডায়েটে কোনো পরিবর্তন না আনা সত্ত্বেও মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে অস্বাভাবিকভাবে ২-৩ কেজি ওজন বেড়ে গেছে, তবে তা মেদ নয়—শরীরে পানি জমার লক্ষণ হতে পারে। হার্ট ফেইলিউর রোগীদের জন্য এটি রোগ অবনতির অন্যতম বড় সতর্কবার্তা।
৪. সার্বক্ষণিক তীব্র ক্লান্তি ও দুর্বলতা
হৃদ্যন্ত্র যখন পেশি ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত পাঠাতে ব্যর্থ হয়, তখন শরীর তার সব শক্তি দিয়ে হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করে। ফলে হাত-পায়ের পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ দৈনন্দিন কাজকর্ম—যেমন বাজার করা বা সামান্য হাঁটাচলাও ভীষণ ক্লান্তিকর মনে হয়।
৫. একটানা কাশি বা বুকে শোঁ-শোঁ শব্দ
ফুসফুসে তরল জমে যাওয়ার কারণে দীর্ঘস্থায়ী কাশি দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে রাতে শুয়ে থাকার সময়। যদি কাশির সঙ্গে সাদা বা হালকা গোলাপি রঙের ফেনাযুক্ত কফ বের হয়, তবে কালবিলম্ব না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
৬. বুক ধড়ফড় ও দ্রুত বা অনিয়মিত স্পন্দন
শরীরে রক্তের ঘাটতি পূরণ করতে হৃৎপিণ্ড অতিরিক্ত দ্রুত কাজ করার চেষ্টা করে। এর ফলে বুক ধড়ফড় করা (Palpitation) কিংবা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (যেমন- অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন) অনুভূত হতে পারে।
৭. ক্ষুধামন্দা ও বদহজমের অনুভূতি
হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা কমে গেলে পরিপাকতন্ত্রে রক্তপ্রবাহ কমে যায় এবং পেটে তরল জমতে পারে। এতে রোগীর খাওয়ার রুচি চলে যায়, অল্প খেলেই পেট ভরা মনে হয় কিংবা প্রায়ই বমি বমি ভাব দেখা দেয়।
৮. বিভ্রান্তি ও মনোযোগে ঘাটতি
মস্তিষ্কে রক্ত ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির সরবরাহ সাময়িকভাবে হ্রাস পেলে রোগীর মধ্যে বিভ্রান্তি, স্মৃতিভ্রম বা ঝিমুনি ভাব দেখা দিতে পারে।
প্রাথমিক শনাক্তকরণই জীবনরক্ষার চাবিকাঠি
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) ও ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজি (ESC)-এর গবেষণা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে হার্ট ফেইলিউর শনাক্ত করা গেলে আধুনিক ওষুধ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ক্ষেত্রবিশেষে আধুনিক ডিভাইসের মাধ্যমে রোগী দীর্ঘকাল সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
কী করবেন?
নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: যাদের ইতিমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ রয়েছে, তারা নিয়মিত শরীরের ওজন ও পায়ের ফোলাভাব পর্যবেক্ষণ করুন।
লক্ষণ নজরে রাখা: নতুন করে শ্বাসকষ্ট বা হঠাৎ ওজন বাড়লে সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
জরুরি সতর্কতা: হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে তীব্র চাপ বা ব্যথা এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে এক মুহূর্তও নষ্ট না করে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করুন।
শেষ কথা:
হৃদয় আমাদের সারা জীবনের সঙ্গী। শরীরের এই বিশ্বস্ত ইঞ্জিনটির দেওয়া মৃদু সংকেতগুলোকে উপেক্ষা না করে সময়মতো সচেতন হোন। আপনার সচেতনতাই দিতে পারে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা।