আজ বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬। বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস (International Day of Older Persons)। প্রবীণ মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর এই দিবস পালন করা হয়। এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য “The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Lives”—যার মূল কথা দীর্ঘায়ুর এই যুগে দীর্ঘ জীবন উপযোগী করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাগুলোকে নতুনভাবে ভাবা।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় বলেছেন, মানুষ ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি দিন বেঁচে থাকছে। বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১২০ কোটি, যা ২০৫০ সালের মধ্যে বেড়ে প্রায় ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। তখন বিশ্বের প্রতি পাঁচজনের একজনের বয়স হবে ৬০ বছর বা তার বেশি।
মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিকে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার অগ্রগতির ফল হিসেবে দেখা হলেও এর সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, পেনশন, উপযুক্ত আবাসন, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
জাতিসংঘ বলছে, বার্ধক্য যেন নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য কিংবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণ না হয়। কর্মসংস্থান, পেনশন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থাকে বয়সবান্ধব করা গেলে প্রবীণ ব্যক্তিরাও পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন।
যেভাবে শুরু আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস
১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৪৫/১০৬ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রতিবছর ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরের বছর, ১৯৯১ সালের ১ অক্টোবর প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। সে হিসাবে ২০২৬ সালে পালিত হচ্ছে ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস।
এরও আগে ১৯৮২ সালে বিশ্ব প্রবীণ সম্মেলনে Vienna International Plan of Action on Ageing গৃহীত হয়। পরে ২০০২ সালে দ্বিতীয় বিশ্ব প্রবীণ সম্মেলনে Madrid International Plan of Action on Ageing গ্রহণ করা হয়। প্রবীণ মানুষের অধিকার, স্বাস্থ্য, সামাজিক অংশগ্রহণ ও সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক নীতি তৈরিতে এসব পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
২০২৬ সালের ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান আগামী ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে দীর্ঘায়ুর ফলে সমাজ ও অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া পরিবর্তন এবং দীর্ঘ জীবন উপযোগী নীতি নিয়ে আলোচনা হবে।
বাংলাদেশে ৬০ বছর হলেই প্রবীণ
বাংলাদেশের জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ অনুযায়ী ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিকে প্রবীণ বা সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নীতিমালায় প্রবীণদের মর্যাদা, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও সমাজে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে দ্রুত প্রবীণ জনগোষ্ঠী বাড়ছে। বিভিন্ন জনমিতিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ হতে পারে। ২০৫০ সালে এ সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটিতে পৌঁছানোর প্রক্ষেপণও রয়েছে।
দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম বড় সরকারি কর্মসূচি বয়স্ক ভাতা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে এই কর্মসূচি চালু হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর আওতায় ৬১ লাখ মানুষকে জনপ্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার জন্য ৪ হাজার ৭৯১ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়।
বয়স্ক ভাতার ক্ষেত্রে অবশ্য জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার ৬০ বছরের সংজ্ঞা সরাসরি প্রযোজ্য নয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকাশিত যোগ্যতার শর্ত অনুযায়ী, এই ভাতা পাওয়ার ন্যূনতম বয়স পুরুষের ক্ষেত্রে ৬৫ এবং নারীর ক্ষেত্রে ৬২ বছর। পাশাপাশি আয়সহ আরও কিছু শর্ত রয়েছে।
রিলিজের আগেই থামল GPT-6.1 Astra, নিরাপত্তা পরীক্ষায় উদ্বেগজনক আচরণ
প্রবীণদের আবাসন ও পরিচর্যার ব্যবস্থাও রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত ফরিদপুরের শান্তি নিবাসে প্রবীণদের আবাসন, খাবার, চিকিৎসা ও বিনোদনের ব্যবস্থা থাকার তথ্য সরকারি কর্মকর্তারা জাতীয় সংসদের একটি কমিটিকে জানিয়েছিলেন।
দীর্ঘায়ুর সঙ্গে বাড়ছে নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২০ কোটি। ২০৫০ সালে তা ২১০ কোটিতে পৌঁছানোর প্রক্ষেপণ রয়েছে। একই সঙ্গে বয়সজনিত রোগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়বে।
এ কারণে এবারের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে শুধু দীর্ঘ জীবন নয়, সেই জীবন কতটা সুস্থ, নিরাপদ, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ—সেই প্রশ্নকে সামনে আনা হয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিবের বার্তায় সরকার ও সমাজকে কর্মসংস্থান, পেনশন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘ জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বয়সভিত্তিক বৈষম্য কমিয়ে প্রবীণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস তাই প্রবীণদের প্রতি শুধু সম্মান জানানোর দিন নয়; দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা বিশ্বের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিচর্যা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে গড়ে তোলার বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে।