কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার হরিপুর গ্রামে কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণের জন্য তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ২৪টি কৃষক পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, প্রস্তাবিত জমি অধিগ্রহণ করা হলে পরিবারগুলো জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারাবে। জমি রক্ষায় প্রয়োজনে জীবন দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
রোববার (২৫ অক্টোবর ২০২৬) সকালে বুড়িচং প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরেন হরিপুর গ্রামের কৃষক পরিবারের সদস্যরা। এ সময় জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ পুনর্বিবেচনা করে বিকল্প স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তাঁরা।
স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা সংস্কার, ১২ গ্রামে স্বস্তি
সংবাদ সম্মেলনে গ্রামবাসীর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মোহাম্মদ রবিউল হাসান। এ সময় নেহারা খাতুন, আলমগীর হোসেন, ফরিদ মিয়াসহ স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, হরিপুর গ্রামে প্রস্তাবিত কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে যেসব জমি নির্বাচন করা হয়েছে, সেগুলো তিন ফসলি কৃষিজমি। এসব জমিতে বছরে একাধিকবার ফসল উৎপাদন করে স্থানীয় দরিদ্র কৃষক পরিবারগুলো জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।
কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কৃষিকাজের আয় দিয়েই তাঁদের সংসার পরিচালনা, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো হয়। ফলে জমি অধিগ্রহণ করা হলে শুধু কৃষিকাজই বন্ধ হবে না, পরিবারগুলোর সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে কৃষক পরিবারের সদস্যরা জানান, জমির মালিকদের অধিকাংশই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। তাঁদের মধ্যে কেউ অটোরিকশা চালান, কেউ রিকশা চালান, আবার কেউ অন্য সাধারণ পেশায় নিয়োজিত। এসব পেশা থেকে পাওয়া সীমিত আয়ের পাশাপাশি নিজেদের জমিতে ফসল উৎপাদন করে তাঁরা সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন।
অনেক পরিবারের কাছে প্রস্তাবিত জমির বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদ কিংবা বিকল্প আয়ের উৎস নেই। কয়েকটি পরিবারের বসতভিটাও সংশ্লিষ্ট জমির সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেন তাঁরা।
কৃষকদের আশঙ্কা, অধিগ্রহণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ২৪টি পরিবার ভূমিহীন ও গৃহহীন হয়ে পড়তে পারে। এতে তাঁদের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠবে।
সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অসহায়ত্ব তুলে ধরে কৃষক পরিবারের সদস্যরা বলেন, ‘আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এই ফসলি জমি। জমি হারালে পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা কোথায় যাব, কীভাবে চলব? তাই আমাদের শেষ সম্বল রক্ষায় প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত।’
এ সময় তাঁরা জানান, জমি হারানোর আশঙ্কা তাঁদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
তবে কৃষকেরা স্পষ্ট করেছেন, তাঁরা এলাকায় কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণের বিরোধী নন। বরং শিক্ষার প্রসার ও এলাকার উন্নয়নে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগকে স্বাগত জানান তাঁরা।
তাঁদের আপত্তি মূলত তিন ফসলি কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব নিয়ে। কৃষকদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য এলাকায় পতিত ও অনাবাদি জমি রয়েছে। এসব জমি বিবেচনায় নেওয়া হলে কৃষকদের জীবিকা রক্ষা করেও প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
এ ছাড়া হরিপুর ও আশপাশের এলাকায় সরকারি খাসজমি থাকার কথাও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
কৃষক পরিবারের সদস্যদের দাবি, বুড়িচং উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন ব্যক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য বিনা মূল্যে জমি দান করতে আগ্রহী। তাঁদের প্রস্তাব যাচাই করে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।
এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প জমির সম্ভাবনা যাচাই না করে কেন তিন ফসলি কৃষিজমি প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কৃষকেরা।
সংবাদ সম্মেলনে একটি মহলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে দরিদ্র কৃষক পরিবারগুলোকে ভূমিহীন করার উদ্দেশ্যে এসব জমি নির্বাচনের অভিযোগও করা হয়। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য সংবাদ সম্মেলনের বিবরণে উল্লেখ করা হয়নি।
কৃষকদের দাবি, জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁদের মতামত গ্রহণ এবং সম্ভাব্য বিকল্প স্থান যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলন শেষে কৃষক পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাজী জসিম উদ্দিন, কুমিল্লা জেলা প্রশাসক, ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং বুড়িচং প্রেসক্লাব বরাবর স্মারকলিপি দেন।
স্মারকলিপিতে তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক উদ্যোগ পুনর্বিবেচনা, বিকল্প জমিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ২৪টি কৃষক পরিবারের জীবিকা ও বসতভিটা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
কৃষক পরিবারগুলোর বক্তব্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের মতো উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও আবাসনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তবে জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক প্রস্তাব, বিকল্প জমির সম্ভাবনা এবং কৃষকদের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য সরবরাহ করা হয়নি।