রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাউল সংগীত ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে হামলা এবং বাধার প্রতিবাদে শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের মানববন্ধন ঘিরে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। কর্মসূচিতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা দীপক শীলকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
‘সরকার অনুমোদন দিলে ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হব না’ –আইজিপি
সোমবার (২৬ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের মীনা বাজারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল গানের আসর ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ‘প্রতিবাদী শিল্পী জনতা’র ব্যানারে বিকেল চারটায় মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছিল।
কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিকেল থেকেই ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। মানববন্ধনে অংশ নিতে অভিনেত্রী সুমনা সোমা, নাট্যকর্মী এহসানুল আজিজ বাবু, শামীমা শওকত লাভলী এবং ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা দীপক শীলসহ কয়েকজন শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী সেখানে জড়ো হন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশগ্রহণকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মসূচি শুরুর আগে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া নিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংস্কৃতিকর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে দীপক শীলকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
অভিনেত্রী সুমনা সোমা অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউলদের ওপর হামলা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ জানাতে তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাঁদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে নিষেধ করেন।
সুমনা সোমার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের এক সদস্য ‘জয় বাংলা স্লোগান নষ্ট হয়ে গেছে’ বলে মন্তব্য করেন। এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান দীপক শীলসহ কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবাদ জানানোর পর পুলিশ সদস্যরা তাঁদের টেনেহিঁচড়ে গাড়ির দিকে নিয়ে যান। পরে দীপক শীলকে পুলিশ ভ্যানে তুলে ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
দীপক শীলকে নিয়ে যাওয়ার পরও ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন সুমনা সোমা।
এ সময় কয়েকজন যুবক তাঁকে বাধা দিয়ে সেখানে এ স্লোগান দেওয়া যাবে না বলে জানান। পরে নাট্যকর্মী এহসানুল আজিজ বাবু, শামীমা শওকত লাভলীসহ কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী প্রতিবাদ করলে ওই যুবকেরা পিছু হটেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সংস্কৃতিকর্মীরা পরে সেখানেই বক্তব্য দেন।
সংস্কৃতিকর্মী ফারুক এইচ খান বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল সংগীতের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, শিল্পী-জনতার কর্মসূচিতে বাধা এবং মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা নিন্দনীয়।
তিনি অভিযোগ করেন, সারা দেশে বাউল ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ চলছে। এসব ঘটনার পেছনে স্বাধীনতাবিরোধী ও জঙ্গি মৌলবাদী গোষ্ঠীর মদদ রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ফারুক এইচ খান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষায় ১৯৭১ সালের মতো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
অভিনয়শিল্পী ও নির্দেশক শামীমা শওকত লাভলী বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদ জানাতেই তাঁরা মানববন্ধনে অংশ নিতে এসেছিলেন। কিন্তু পুলিশের বাধার কারণে নির্ধারিত কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লাভলীর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক বাউল ও সংস্কৃতিকর্মী কর্মসূচিতে যোগ দিতে এসেও অংশ নিতে পারেননি। সাধারণ মানুষ এবং সংহতি জানাতে আসা বাউলদের অনেকে ভয়ে ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান।
ফলে কর্মসূচি শুরুর আগেই তা পণ্ড হয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
শামীমা শওকত লাভলী আরও বলেন, তাঁরা কোনো রাজনৈতিক ব্যানারে কর্মসূচি করতে কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে সেখানে যাননি। বাউল সংগীত ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের ওপর বাধার প্রতিবাদ জানানোই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য।
‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া যাবে না—এমন বাংলাদেশ তাঁরা চাননি বলেও মন্তব্য করেন এই সংস্কৃতিকর্মী।
তবে মানববন্ধনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত মিজান নামের এক পুলিশ সদস্য।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মানববন্ধনে কাউকে বাধা দেওয়া হয়নি। একজন ব্যক্তি উগ্র আচরণ করায় তাঁকে পুলিশ ভ্যানে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হয়ে উঠেছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীপক শীলকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পুরো বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তবে দীপক শীলের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করা হয়েছে কি না কিংবা তাঁকে পরবর্তী সময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরবরাহ করা তথ্যে কিছু উল্লেখ নেই।
এদিকে শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তাঁদের কর্মসূচিই বাধার মুখে পড়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীপক শীলকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
ফলে ধানমন্ডির এ ঘটনায় পুলিশের পদক্ষেপের কারণ এবং মানববন্ধনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।