পটুয়াখালীর গলাচিপার দুর্গম চরকারফারমায় বিদ্যালয় থাকলেও সেখানে পৌঁছানোর উপযুক্ত পথ নেই। প্রতিদিন পাঁচটি খাল সাঁতরে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে অন্তত ২০ থেকে ৩০ শিক্ষার্থীকে। বই-খাতা পানির হাত থেকে বাঁচাতে উঁচু করে ধরে সাঁতার কাটার পর ভেজা পোশাকেই সারাদিন ক্লাস করতে হচ্ছে শিশুদের।
২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫১ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের মধ্যে ছাত্র ২৬ ও ছাত্রী ২৫ জন। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বছরের প্রায় পুরো সময়ই যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতির ওপরও।
চরটির বিভিন্ন এলাকা থেকে বিদ্যালয়ে আসা অন্তত ২০ থেকে ৩০ শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন একের পর এক পাঁচটি খাল সাঁতরে পার হতে হয়। শুকনো বা নিরাপদ চলাচলের পথ না থাকায় বই-খাতা মাথার ওপর কিংবা উঁচু করে ধরে পানিতে নামতে হয় তাদের। এরপরও বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের সময় বই-খাতা ভিজে নষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটে।
খাল সাঁতরে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর সময় শিক্ষার্থীদের পোশাকও ভিজে যায়। পোশাক পরিবর্তনের সুযোগ না থাকায় অনেককে সেই ভেজা কাপড়েই দীর্ঘ সময় ক্লাস করতে হয়। এতে অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে কারও কারও কয়েক দিন বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।
কিছু পরিবারের মাছ ধরার নৌকা থাকলেও সেগুলো পরিবারের জীবিকার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য নৌকা নিয়মিত পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে সাঁতারই তাদের প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্ষা ও জোয়ারের সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। চরটিতে বেড়িবাঁধ না থাকায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও চলাচলের পথের বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। প্রতিদিনের এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের কারণে বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিশুর মধ্যে বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগ্রহও কমে আসছে।
গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অংশ চরকারফারমা। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে আগুনমুখা, রামনাবাদ ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত চরটি প্রাকৃতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল।
চরটিতে বসবাসকারী প্রায় ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবারের শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হলেও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষেও নিজেদের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সড়ক নির্মাণ করা কঠিন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় অধিবাসীদের নিজেদের অর্থায়নে সড়ক নির্মাণের সামর্থ্য নেই। শিশুদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি উপযুক্ত রাস্তা নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নেছার উদ্দিনের মতে, যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হলে নিয়মিত উপস্থিতির পাশাপাশি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
গলাচিপা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযুক্ত পথ না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে বর্তমানে এ কাজের জন্য বিশেষ কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে নতুন বরাদ্দ পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর পরিস্থিতিটিকে দুঃখজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের বিষয়টি অবহিত করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হকও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। দুর্গম এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শনের পর পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন পাঁচটি খাল সাঁতরে পার হওয়ার এই পরিস্থিতিতে চরকারফারমার শিশুদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জোরালো হচ্ছে।