কনের বাড়িতে ধুমধাম করে অনুষ্ঠিত হয়েছিল গায়ে হলুদ, বরযাত্রী নিয়ে গিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি মেনেই সম্পন্ন হয়েছিল বিয়ে। বাসর রাতের পর স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনের শুরু হলেও বাল্যবিয়ের নিবন্ধনহীনতার আইনি ফাঁদে পড়ে আজ শ্রীঘরে ঠাঁই হয়েছে বরের। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় পারিবারিকভাবে ঘটা করে বিয়ের পরও স্ত্রীর পরিবারের করা অপহরণ ও ধর্ষণ মামলায় প্রায় দেড় মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন বর রুমন খন্দকার (২০)।
ভুক্তভোগী রুমন খন্দকার নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের বাসিন্দা।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ মে ২০২৬ তারিখে ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের মিরাজ মাতুব্বরের ১৫ বছর বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে মিলা আক্তারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে রুমনের বিয়ে হয়। বিয়ের পূর্বে কনের বাড়িতে আনন্দঘন পরিবেশে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে প্রায় ৪০ জন বরযাত্রীর উপস্থিতিতে সামাজিক রীতি অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন করে নববধূকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন রুমন। তবে কনের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় উভয় পরিবারের সম্মতিতে তাৎক্ষণিকভাবে বিয়ে রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন করা হয়নি। সিদ্ধান্ত ছিল, কনে প্রাপ্তবয়স্ক হলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কাবিন সম্পন্ন করা হবে।
বিয়ের কিছুদিন পর নববধূ মিলা আক্তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে যান। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি আর স্বামীর সংসারে ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানান। স্থানীয়দের একাংশ ও বরের পরিবারের অভিযোগ, মেয়েটির অন্য এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠার কারণেই এই দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে কনের দাদি জহুরন খাতুন বাদী হয়ে নগরকান্দা থানায় রুমন খন্দকারের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ ও ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে অভিযোগ আনা হয়, গত ১৯ জুন বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে মিলা আক্তারকে মাইক্রোবাসে করে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান রুমন এবং নিজ বাড়িতে আটকে রেখে রাতভর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করেন।
মামলার পর কনেপক্ষ বিয়ের বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করে দাবি করছে, তাদের মধ্যে কোনো বিয়েই হয়নি; রুমন জোরপূর্বক অপহরণের পর ধর্ষণ করেছেন। তবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, ছবি ও ভিডিওর প্রসঙ্গ তুললে তাঁরা এড়িয়ে যান। অভিযোগ পাওয়ার পরই গত ২ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ রুমনকে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায়।
এ বিষয়ে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ জানান, কনেপক্ষ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) চিকিৎসার ছাড়পত্রসহ লিখিত অভিযোগ দায়ের করে, যেখানে ধর্ষণের প্রাথমিক আলামতের উল্লেখ রয়েছে। এজাহারে বিয়ের কোনো তথ্যের উল্লেখ ছিল না।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, কনের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় এটি স্পষ্টত একটি বাল্যবিয়ে এবং নিবন্ধন না থাকায় এর কোনো আইনি বৈধতা নেই। বাল্যবিয়ে গোপনের জন্য নিবন্ধন না করার এই সুযোগ ও আইনি দুর্বলতাকেই কনেপক্ষ কাজে লাগিয়েছে। এই বাল্যবিয়ের পেছনে কোনো কাজি বা নিবন্ধক জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা মনে করছেন, পারিবারিকভাবে ঘটা করে বিয়ের পর এমন ধর্ষণের মামলা নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। তবে বাল্যবিয়ের কোনো আইনগত ভিত্তি না থাকায় ঘটনাটির গভীর তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।