বর্ষার আকাশে মেঘ জমেছে। চারদিকে পানি, আর সেই পানির বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে একটি নৌকা। কোথাও মাঝি মাছ ধরছেন, কোথাও নৌকায় যাতায়াত করছেন হাওরপাড়ের মানুষ। দূরে জেগে থাকা কোনো চর আবার কিছুক্ষণ পর ঢেউয়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। নিকলী কিংবা মিঠামইনের হাওরে বর্ষার দিন এমনই।
বাংলাদেশের হাওর-বাঁওড়ের তালিকায় টাঙ্গুয়ার হাওর, নিকলী ও মিঠামইন হাওরের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এসব হাওরের রূপ বদলে যায়। বছরের অন্য সময় যেখানে সবুজ বিস্তারের দেখা মেলে, বর্ষায় সেখানে পানি আর পানির বিস্তৃতি।
ছোট-বড় বিল, নদী ও জলাধারগুলো তখন একে অপরের সঙ্গে মিশে বিশাল জলরাশির সৃষ্টি করে। দূর থেকে তাকালে সেই জলরাশি অনেক সময় সমুদ্রের মতোই মনে হয়। খোলা হাওরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাস আর ঢেউয়ের শব্দ শহুরে ব্যস্ততার সম্পূর্ণ বিপরীত এক পরিবেশ তৈরি করে।
এই পরিবর্তিত প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে বর্ষাই যেন সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। নৌকার ধীর গতি, পানির ওপর বাতাসের ছোঁয়া আর হাওরপাড়ের মানুষের প্রতিদিনের জীবন মিলিয়ে তৈরি হয় অন্য রকম এক ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।
নিকলী হাওরে বর্ষার দৃশ্য আরও একটু আলাদা। চারপাশে যতদূর চোখ যায়, অথই পানি। এই পানির সঙ্গেই বদলে যায় মানুষের চলাচলের ধরন। নৌকা হয়ে ওঠে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। হাওরপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নৌকার এই সম্পর্ক ভ্রমণকারীর চোখেও আলাদা এক দৃশ্য হয়ে ধরা দেয়।
কখনো দেখা যায় মাঝি নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে বের হয়েছেন। কোথাও হাওরের তাজা মাছ দিয়ে দুপুরের খাবারের আয়োজন। আবার কোথাও জেগে ওঠা চর হাওরের বিস্তৃত জলরাশির মধ্যে তৈরি করে ভিন্ন এক দৃশ্যপট। প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষের এই জীবনযাপনই নিকলী হাওর ভ্রমণকে শুধু বেড়ানোর মধ্যে আটকে রাখে না, বরং হাওরাঞ্চলের বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে যায়।
নিকলীতে হাওর দেখার পাশাপাশি গুরই শাহি জামে মসজিদ ও পাহাড় খাঁর মাজারও ঘুরে দেখা যায়। ফলে এক দিনের ভ্রমণেও প্রকৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্যের দুটো দিকই দেখার সুযোগ থাকে।
বর্ষাকালে নিকলী হাওর ঘুরে দেখার উপযুক্ত সময় জুলাই থেকে অক্টোবর। ২১৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের নিকলী উপজেলার বড় একটি অংশ এ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকে। তাই বর্ষায় এখানকার বিভিন্ন জায়গায় চলাচলের জন্য নৌকা কিংবা ট্রলারই ভরসা।
নিকলী হাওরে যেতে হলে প্রথমে পৌঁছাতে হবে কিশোরগঞ্জ জেলা সদর অথবা কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাস কিংবা ট্রেনে কিশোরগঞ্জে যাওয়া যায়। এরপর ইজিবাইক বা অটোরিকশায় নিকলী হাওরের বেড়িবাঁধে পৌঁছানো যায়।
কিশোরগঞ্জ সদর থেকে নিকলীর দূরত্ব প্রায় ২৫ থেকে ২৭ কিলোমিটার। সড়কপথে যেতে সময় লাগে আনুমানিক এক ঘণ্টা। ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকা ভ্রমণপ্রেমীরা চাইলে পরিকল্পনা করে এক দিনেই নিকলী ঘুরে ফিরতে পারেন।
নিকলীর পর হাওরের আরেক আকর্ষণ মিঠামইন। কিশোরগঞ্জ জেলার এই উপজেলাকে কেউ মিঠামন, কেউ মিটামন আবার কেউ মিটাইমন নামেও চেনেন। নামটির উৎপত্তি নিয়েও স্থানীয়ভাবে একটি প্রচলিত মত রয়েছে।
সেই মত অনুযায়ী, মিঠামইন গ্রামের আশপাশে একসময় প্রচুর মিষ্টি বা মিঠা রসের খাগড়ার বন ছিল। সেই বন থেকেই প্রথমে ‘মিঠাবন’ এবং পরে পরিবর্তিত হয়ে ‘মিঠামইন’ নামটি এসেছে বলে প্রচলিত আছে।
ভৌগোলিকভাবেও মিঠামইনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরে ইটনা, দক্ষিণে অষ্টগ্রাম এবং পশ্চিমে নিকলী উপজেলা। হাওরের বিস্তৃত এলাকার মধ্যে অবস্থান হলেও মিঠামইনকে একটি প্রাচীন জনপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এখানে হাওরের পাশাপাশি দেখার মতো রয়েছে মালিকের দরগা, দিল্লির আখড়া, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও মসজিদ। আর হাওরের স্বাদ নিতে চাইলে স্থানীয় হোটেলগুলোতে পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের তাজা মাছের পদ।
মিঠামইনে থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে। বিভিন্ন মানের ছোট-বড় হোটেল ও রিসোর্টের পাশাপাশি উপজেলা পরিষদের ডাকবাংলোতেও থাকার সুযোগ আছে। তবে সেখানে রাত কাটানোর পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই বুকিং করে নেওয়া প্রয়োজন।
মিঠামইন শহরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো হওয়ায় ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে জায়গাটির আকর্ষণ ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে কম সময়ে হাওরের পরিবেশ ঘুরে দেখার সুযোগ থাকায় অনেকেই এটিকে ভ্রমণতালিকায় রাখছেন।
মিঠামইন যেতে হলেও শুরুটা কিশোরগঞ্জ জেলা সদর থেকেই। বাস বা ট্রেনে কিশোরগঞ্জে পৌঁছে সেখান থেকে যেতে হবে বালিখলা ঘাটে। এরপর ঘাট থেকে ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে হাওরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়।
চাইলে ঘণ্টা হিসেবে অথবা পুরো দিনের জন্য নৌকা নেওয়া যায়। নৌকার আকার, মৌসুম এবং ছুটির দিনের ওপর ভাড়া কমবেশি হয়। বালিখলা ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় মিঠামইন যেতে সাধারণত প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগে।
তবে বর্ষার সঙ্গে এই পথের চেহারাও বদলে যায়। শুকনো মৌসুমে হাওরে পানি থাকে না। তখন বালিখলা ঘাট থেকে নদী পার হয়ে সড়কপথেও মিঠামইনে যাওয়া সম্ভব।
হাওর ভ্রমণের সৌন্দর্যের সঙ্গে অবশ্য কিছু সতর্কতার বিষয়ও জড়িয়ে আছে। বর্ষায় খোলা জলরাশিতে তীব্র বাতাস ও ঢেউ ওঠা অস্বাভাবিক নয়। নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য যতটা আকর্ষণীয়, নিরাপত্তার বিষয়টি ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
তাই নৌকায় ওঠার পর নিজের নিরাপত্তার জন্য লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা জরুরি। একা যাওয়ার বদলে চার থেকে পাঁচজনের দল করে গেলে নৌকা বা ট্রলার ভাড়া ভাগ করে নেওয়া যায়, ফলে খরচও তুলনামূলক কম পড়ে।
রওনা হওয়ার আগে স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে নেওয়াও ভালো। কারণ হাওরের প্রকৃতি যেমন দ্রুত বদলে যেতে পারে, তেমনি খোলা জলরাশিতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাবও সরাসরি পড়ে।
শেষ পর্যন্ত হাওর ভ্রমণ শুধু পানির ওপর নৌকা চালিয়ে ঘুরে বেড়ানোর নাম নয়। এটি এমন এক জায়গায় কিছু সময় কাটানো, যেখানে মানুষের জীবন, প্রকৃতি আর ঋতুর পরিবর্তন একসঙ্গে চোখের সামনে ধরা দেয়।
বর্ষা চলে গেলে সেই জলরাশি আবার সরে যাবে, বদলে যাবে হাওরের পথঘাট ও চারপাশের দৃশ্য। কিন্তু বর্ষার সেই বিস্তৃত জল, নৌকার দুলুনি, মাঝির অপেক্ষা আর দূরের চর মিলে যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা মনে থেকে যায় অনেক দিন। হাওর তখন শুধু একটি ভ্রমণস্থল নয়, হয়ে ওঠে বাংলাদেশের জলজ জীবনের এক জীবন্ত গল্প।