জুলাই মাসজুড়ে নোয়াখালীর সদর, সোনাইমুড়ী, সুবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জসহ কয়েকটি উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে ঘটেছে ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা, যার জেরে জেলাজুড়ে বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র উদ্বেগ। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২৪ জুলাই রাতে, যখন একই রাতে সদর ও সোনাইমুড়ীতে সংঘটিত হয় দুটি বড় ধরনের ডাকাতি। একদল সশস্ত্র ডাকাত কালিতারা বাজার এলাকার একটি তামাক কোম্পানির অফিসে হানা দিয়ে নগদ অর্থ ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়, আর একই রাতে সোনাইমুড়ীর একটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ডাকাত দল স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে। এর আগে সুবর্ণচরে খোদ এক পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতেও ডাকাতির ঘটনা ঘটে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে বাড়তি উদ্বেগের জন্ম দেয়। এসবের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং প্রকাশ্যে অস্ত্রের মুখে ছিনতাইয়ের অভিযোগও সামনে এসেছে।
একের পর এক এমন ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভও বাড়তে দেখা গেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটে কবিরহাটে, যেখানে ডাকাতি মামলার এক আসামিকে উত্তেজিত জনতা গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনার পর স্থানীয়দের একাংশের মিষ্টি বিতরণের খবরও জনমনে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশার একটি চিত্র তুলে ধরে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব ঘটনার তদন্তে উঠে আসছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—বাসাবাড়িতে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরার অভাব। জেলার অধিকাংশ আবাসিক ভবন ও বাড়িতে নিরাপত্তা ক্যামেরা না থাকায় ডাকাত বা চোরের পরিচয় শনাক্ত এবং ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনে পুলিশকে বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। বাড়ির মালিকদের একটি বড় অংশ বাড়তি খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলার কথা বিবেচনা করে সিসি ক্যামেরা স্থাপনে অনীহা দেখান, যা অপরাধীদের জন্য কার্যত সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। বিশেষত প্রত্যন্ত ও অপেক্ষাকৃত অরক্ষিত এলাকাগুলোতে এই ঘাটতি আরও প্রকট, যেখানে ডাকাত দল অপেক্ষাকৃত সহজেই লক্ষ্যবস্তু বেছে নিতে পারছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নেমেছে পুলিশও, জোরদার করা হয়েছে অভিযান। সোনাইমুড়ীতে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে দেশীয় অস্ত্রসহ আটজনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন থানা পুলিশ মোটরসাইকেল চোর চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং চোরাই মালামাল উদ্ধারে একাধিক পৃথক অভিযান পরিচালনা করেছে। এর পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সিসি ক্যামেরা স্থাপনে বাসিন্দাদের উৎসাহিত করার তাগিদ দিচ্ছেন স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারাও, যাতে ভবিষ্যতে অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রকৃত অপরাধী শনাক্তকরণ সহজতর হয়।
সার্বিক বিবেচনায়, সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ নোয়াখালীর কয়েকটি উপজেলায় অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। তবে পরিস্থিতির প্রকৃত গভীরতা নিরূপণে প্রয়োজন জেলা পুলিশের ধারাবাহিক অপরাধ পরিসংখ্যান, প্রতিটি মামলার তদন্ত অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং নিরাপত্তা অবকাঠামোর ঘাটতি পূরণে সমন্বিত উদ্যোগ, যা ভবিষ্যতে এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।