সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নাম উল্লেখ করে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দেওয়া দুটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একটি পোস্টে নিজের মৃত্যুর জন্য ইউএনওকে দায়ী করার কথা লেখেন তিনি। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আরেকটি পোস্টে প্রশাসন ক্যাডার থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ঘটনার পর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে সিলেট এবং পরে ঢাকায় নেওয়া হয়েছে।
সৌদির কারাগারে সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি
আলোচিত ওই কর্মকর্তার নাম মো. আরিফুর রহমান শান্ত। তিনি প্রায় দুই মাস ধরে জামালগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্ত্রীকে নিয়ে উপজেলা সদরে বসবাস করেন তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর ২০২৬) রাত পৌনে ১১টার দিকে আরিফুর রহমানের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে প্রথম পোস্টটি প্রকাশিত হয়। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমার মৃত্যুর জন্য শিল্পী রানী মোদক (ইউএনও) দায়ী থাকবেন।’
এর কয়েক মিনিট পর একই আইডি থেকে ইংরেজিতে আরেকটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে লেখা হয়, ‘আই রিজাইন ফ্রম অ্যাডমিন ক্যাডার।’ অর্থাৎ, তিনি প্রশাসন ক্যাডার থেকে পদত্যাগ করছেন বলে উল্লেখ করেন।
পোস্ট দুটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি জানার পর পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরিফুর রহমানের বাসায় যান।
এদিকে ঘটনার পরপরই জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রানী মোদক ‘ইউএনও জামালগঞ্জ’ নামের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে জানান, এসিল্যান্ডের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টি নিয়ে কাউকে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ করেন।
পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে ইউএনও জানান, ঘটনার রাতে আরিফুর রহমানের আচরণ অস্বাভাবিক ছিল। তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন।
ঘটনার পূর্বাপর বর্ণনা দিতে গিয়ে শিল্পী রানী মোদক জানান, শুক্রবার তাঁর তিন বছর বয়সী মেয়ের জন্মদিন ছিল। এ উপলক্ষে রাতে বাসায় কেক কাটার আয়োজন করা হয়। সেখানে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন এসিল্যান্ড আরিফুর রহমান।
ইউএনওর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাসা থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আরিফুর রহমানের ফেসবুক আইডি থেকে আলোচিত পোস্টটি দেওয়া হয়।
নিজের নাম উল্লেখ করার কারণ সম্পর্কে শিল্পী রানী মোদক বলেন, ‘এটা আমারও প্রশ্ন। আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।’
তিনি জানান, পোস্ট দেওয়ার মাত্র ছয় মিনিট আগেও এসিল্যান্ড তাঁর বাসায় ছিলেন। আরিফুর রহমান সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর বিষয়টি নিয়ে কথা বলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি।
ইউএনওর অভিযোগ, ঘটনার রাতে আরিফুর রহমান একজন আনসার সদস্যকে মারধর করেন। একই সঙ্গে তাঁর তিন বছর বয়সী মেয়েকে হত্যার হুমকি দেন। রাস্তায় কয়েকজনের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও করেন তিনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আরিফুর রহমানের নিজস্ব বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শিল্পী রানী মোদক আরও জানান, আরিফুর রহমানের স্ত্রীর কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, ওই কর্মকর্তার আগে থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা ছিল বলে পরিবারের দাবি।
এ ছাড়া ঘটনার তিন দিন আগে জামালগঞ্জে পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়। ওই শিশুর মরদেহ দেখার পর আরিফুর রহমান মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে তাঁর স্ত্রীর বরাতে জানান ইউএনও।
জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বন্দে আলী মিয়া জানান, ফেসবুক পোস্টের বিষয়টি জানার পর তিনি অন্যদের সঙ্গে এসিল্যান্ডের বাসায় যান। সেখানে গিয়ে তাঁর আচরণ অস্বাভাবিক মনে হয়।
ওসি বলেন, ওই সময় ঘটনাস্থলে সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধিসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আরিফুর রহমানের স্ত্রীর পরামর্শে তাঁকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয় বলে জানান ওসি। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় একটি ইনজেকশনের ব্যবস্থা করার কথা ওঠে। শেষ পর্যন্ত সেটি পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী সময়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক এবং পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
রাত আনুমানিক একটার দিকে আরিফুর রহমানকে সিলেটের উদ্দেশে পাঠানো হয়। সেখানে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। পরে স্থানান্তর করা হয় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরামর্শে শনিবার পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যান।
সরবরাহ করা সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আরিফুর রহমান ঢাকায় পরিবারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জামালগঞ্জের ইউএনও শিল্পী রানী মোদক জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতেই ঘটনাটি জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে।
তবে আরিফুর রহমানের ফেসবুক আইডি সত্যিই হ্যাক হয়েছিল কি না, পোস্টগুলো কী পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা কী—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আরিফুর রহমান সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে।